Search

স্বাতীলেখার শেষ বেলা

পূজা ব্যানার্জ্জী

বিশ্বনাথের অনস্ক্রিন ঘরণী আরতির আজ ৭মাস আগে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু। আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন,স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। জন্মস্থান উত্তরপ্রদেশের ১৯৫০সাল। মায়ের দিক থেকে পাওয়া প্রতিভার ছোঁয়া আমরা পেয়েছি সত্যজিৎ রায়ের "ঘরে বাইরে" ছায়াছবির বিমলার চরিত্রে। অসামান্য অভিনয় দক্ষতা যা এখুনকার প্রজন্মকেও নাড়া দেয়।

বৈবাহিক সূত্রে ১৯৭২এ তিনি কলকাতা আসেন। বৈবাহিক জীবন দীর্ঘ না হলেও প্রবাস ছেড়ে নিজের অজান্তেই সক্রিয় কলকাতাবাসী হয়ে ওঠেন। ইংরাজি সাহিত্যের ছাত্রী ১৯৭৮ সাল থেকে পাকাপাকি ভাবে নান্দীকার নাট্যগোষ্ঠীর সাথে যুক্ত হন ঠিক যে সময় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মানুষ দল ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর স্বামী রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের ভাঙতে থাকা গোষ্ঠীর হাল ধরেছিলেন তিনি নিজেই।

সাত বছরের ছোট্ট মেয়েটি সেই সময় থেকেই মঞ্চকে আঁকরে ধরে বাঁচা শুরু করে দিয়েছিল। মন্মথ রায়ের "কারাগার" এর কংসরক্ষিতা থেকে যাত্রা শুরু, অভিনীত চরিত্রের বলিষ্ঠতা ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে আরো দৃঢ় হয়ে দর্শকদের কাছে পৌঁছতে থাকে। বাংলার পাশাপাশি হিন্দি ও ইংরাজী ভাষাতেও কাজ করেছেন তিনি। ওথেলো'র ডেসডিমনা, "মিড সামার নাইট ড্রিম" এর পাক, "অ্যাজ ইউ লাইক ইট" -এর অরল্যান্ড -- পরপর নানা চরিত্রে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন এলাহাবাদের রানী। এর পাশাপাশি তিনি সংগীত চর্চা করতে লন্ডন যান এবং ট্রিনিটি কলেজ অফ মিউজিকে পাশ্চাত্য মার্গের সংগীত নিয়ে ডিপ্লোমা করেন, নাটকের পোশাক সম্পর্কে নতুন ভাবে পড়াশোনাও করেন। অভিনয়ের সাথে সাথে তিনি নানা নাটকের মিউজিক বিভাগে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছেন বহুবছর। স্বাতীলেখা দেবীর প্রথম পরিচিতি ঘটে তাঁর অভিনীত "আন্তিগোনে" নাটকের মাধ্যমে। সর্বস্ব বাজি রেখে স্বামী স্ত্রী একসাথে জুটি বাঁধেন। দর্শক আসনে বসে থাকা মানুষেরা মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন তাদের স্বতন্ত্র অভিনয় কৌশল। পরবর্তীকালে অভিনয় করেছেন শম্ভু মিত্রের মত একজন বড় মাপের মানুষের সাথে।

অভিনয় দক্ষতা এবং মিউজিক সেন্স থাকা স্বাতীলেখা দেবীকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

সিনেমা জগতে ১৯৭৫ এর সত্যজিৎ রায়ের "ঘরে বাইরে"-এর পর ওনাকে রূপালী পর্দায় দেখা যায়নি। খুব সাম্প্রতিক, ২০১৫ সালের বড় পর্দার ছবি বেলাশেষেতে ওনাকে আমরা আবার দেখতে পাই। আরতি দেবীর সাথে আমাদের আলাপ হয়। আরতি দেবীকে বিভিন্ন বয়সের দেখা বা বোঝা পুরোপুরি আলাদারকম। তবু কোথাও না কোথাও এই চরিত্র আমাদের স্পর্শকাতর একটা জায়গায় নরম হাতের ছোঁয়া দেয়। নিখিলেশের স্ত্রী থেকে বিশ্বনাথের ঘরণী, মাঝের পথটা খুব সহজ ছিল না। নান্দীকার গোষ্ঠীর প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। মাঝের সময়টায় মঞ্চ মাতিয়ে রেখেছিলেন স্বমহিমায়। পাঞ্চজন্য, বিপন্নতা, নাচনী, অযত্নবাস, পাতা ঝরে যায় এর মত বহু নাটকে তাঁর অভিনয় অভাবনীয়। রীতিমত থিয়েটার মঞ্চ কাঁপিয়েছেন বেশ কিছু দশক নিজ গুণের ছটায়। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে তাঁর অভিনীত "বেলাশুরু"।

করোনা আবহের ঠিক আগে ডিসেম্বরে ওনাদের নাট্যগোষ্ঠীর এক অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা যায় শেষবারের মত। ইচ্ছা ছিল,সব মিটে গেলে আবার ফিরবেন। তার মাঝেই ১৬ই জুন,২০২১ পথ আলাদা হয়ে গেল তাঁর। বাহুল্যতা বর্জিত ৭১ বছরের জীবনের সব হিসেব কেমন যেন সমাধানহীন হয়েই হয়ে গেল। তারার রাজ্যে আরো এক তারার সংযোজন হয়ে গেল আমাদের অনুমতি ছাড়াই।

69 views4 comments